#পর্বসংখ্যা২১
#হ্রদয়ামিলন
#Shavakhan
কচের দড়জা ঠেলে সারহাদের কেবিনে প্রবেশ করে সানা। সঙ্গে সঙ্গেই তার নাকে এলো এক অদ্ভুত,
গাঢ়, অনির্দিষ্ট এক সুগন্ধ। ধোঁয়াটে স্যান্ডালউড ও ভ্যানিলার, সঙ্গে রহস্যময় অ্যাম্বার ও মিষ্টি ঘাসের ধোঁয়া। 'ব্ল্যাক ফ্যান্টম' পারফিউমের।
ঘরের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে শান্ত। সানার হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে মেঝেতে তার পরা হিলের শব্দ
অস্বাভাবিক ভাবে জোরে শোনাচ্ছে।
সানা না চাইতেও তার নজর দেয়ালের চিত্রকর্মগুলোর উপর পড়ে। ঐদিন তাড়াহুড়ায় এগুলো নজরেই আসেনি। সানার মনে হচ্ছে পেইন্টিং গুলো একেবারেই অজানা এবং বোঝার উপায়হীন। প্রতিটি পেইন্টিং কোন মেয়ের এটুকু শুধু বোধগম্য হচ্ছে তার। সাথে একটা খালি ক্যানভাস ও ঝুলিয়ে রাখা।
সানা অবচেতনভাবে চিত্রগুলোর দিকে কতক্ষণ তাকাল,কেমন যেন তার মনে হচ্ছে চিত্রগুলো তার দিকে সরাসরি তাকিয়ে আছে।
সানার ভাবনার সমাপ্তি ঘটে যখন সারহাদের গম্ভীর কন্ঠে তার কানে ভেসে আসে,
-"সিমরান.... টেক আ সিট"
সানা কোনরকম বাক্য ব্যয় না করে বসে পড়ে। সারহাদ নিজের চশমাখানা মধ্যমা দিয়ে আরেকটু উপরে তুলে শীতল কন্ঠে শুধালো,
-"তোমার অফিস কেমন লেগেছে?"
সানা মনে মনে ভাবছে'এত জরুলি তলব করেছে এটা জিজ্ঞেস করার জন্য নাকি'। কিন্তু মুখে ফোটে অন্য কথা,
-"খুব ভালো স্যার, আমার ডিজাইন গুলো....."
-"হ্যা তোমার নতুন ডিজাইন গুলো আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দাও"
সানা কিছুটা দ্বিধা দ্বন্দ্বের সাথে বলে ওঠে,
-"স্যার আমার কাছে তো আপনার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার নেই, আমি বরং ই-মেইলে..."
সানার কথা থেমে গেল যখন সারহাদ নিজের ফোন খানা তার দিকে বাড়িয়ে দিল। সানা না চাইতেও হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিয়ে নিজের নাম্বার টাইফ করতে শুরু করল।তার কেমন একটা গাঁ ছমছমে ভাব হচ্ছে। এদিকে সারহাদের ঠোঁটের কোণে রহস্যের ঘনঘটা। এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার সামনে বসা মানবীর দিকে। হঠাৎ সে হাত দিয়ে টেবিলের উপরে থাকা রহস্যময় কালো স্ফটিকের গোলকটা হালকা ঘোরালো। একটা অদ্ভুত ভয়ার্ত শব্দ তৈরি করে এটি ঘুরতে শুরু করল। সানা একপলক সেদিকে তাকিয়ে পরপর চোখ নামিয়ে সারহাদের দিকে ফোনটা এগিয়ে দিল।
সারহাদ ফোন হাতে নিয়ে কিছু বলার আগেই এসপির প্রবেশ ঘটে। সানা মনে মনে একটু স্বস্তি ফিরে পায়,
-"ব্রো আম হেয়ার"
এই বলে এসপি সানার পাশের চেয়ার খানা দখল করে ধপ করে বসে পড়ল। সারহাদ নিজের দৃঢ়তা বজায় রেখে বলল,
-"তো সিমরান তোমাকে আলাদা কেবিনে শিফট করা হলো সাথে এসপি আজ থেকে তোমার এসিস্ট্যান্ট হিসেবে থাকবে"
সানার কপালে ভাঁজ পড়ে, সে বুঝলো না সারহাদের কথার অর্থ। তার মুখ থেকে কোন শব্দ বেরোনোর আগেই এসপি বলে ওঠে,
-"আমার মা, তোকে আমি খাঁটি বাংলায় বুঝাবো চল"
সানা কথা বাড়ালো না, 'ওকে স্যার' বলে দরজার দিকে চলে যায়। এসপি সারহাদের দিকে হাত নেরে,
"বাই ব্রো" বলে চলে যায়।
এদিকে সারহাদ কিছু না বলে ড্রয়ার খুলে একটা ড্রার্টস্ বের করে নিশানা লাগায় খালি ক্যানভাসের দিকে। নিখুঁতভাবে লেগে যায় তার নিশানা ঠিক মাঝখানে। সারহাদ ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসির রেখা ফুটিয়ে গম্ভীর কণ্ঠ বিড়বিড়ালো,
-"It's your turn to paint"
____________________________
গিনির উত্তপ্ত দুপুরকে চিরে এক রাজকীয় গর্জনে ঢুকে আরজের দামি 'রুলস-ওয়েলস'।গাড়ির দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে মহাকর্ষ যেন থমকে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য।
বাম পাশে কাইলিন আর ডান পাশে জ্যাক। দুজনের ঠান্ডা মুখ, যন্ত্রমানবের মতো নিখুঁত গণনায় হাঁটা। যেন এক মুহূর্তে কারও অস্তিত্ব মুছে দিতে পারে।
পেছনে ছায়ার মতো সরে এল তিন-চারজন স্থূলদেহী বডিগার্ড, তাদের কালো স্যুট বাতাস ছেদন করে আরজেকে কেন্দ্র করে একটি চলমান দুর্গ তৈরি করল।
চারপাশে তখন আগুন লেগে গেছে উত্তেজনায়,
মেয়েদের কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়ছে ক্রমাগত, ইতিমধ্যে ভীর লেগে গেছে।
আরজে শুধু একবার চোখ তুলে তাকাল চারপাশে। তারপর এগিয়ে গেল ভিআইপি লিফটের দিকে।ভারী লিফটের দরজা সসম্মানে খুলে গেল। আরজে একবারও পেছন ফিরে তাকাল না।
সারা হলঘর তাকে চাইলো, ডাকলো
কিন্তু সে সবকিছু নিঃশব্দে পিছনে ফেলে
নির্বিকার ভঙ্গিতে লিফটে প্রবেশ করল।
__________________________
দুই তালার ক্যান্টিনে বসে আছে সানা আর এসপি। এসপির দুঃখ ভরা কাহিনী শুনে সানার পেট ফেটে হাসি আসছে। কিন্তু এটা পাবলিক প্লেস বলে হাসতেও পারছেনা,
-"তারমানে তোর হরপ্পা মামা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়া ছাড়া তোর পেছনে পড়ে আছে।"
-"হ্যা, কী আর বলবো, আই থ্রিংক উনি ভাবেন পৃথিবীর প্রথম যুদ্ধ, দ্বিতীয় যুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, আর যা যা হবে বা হচ্ছে সব আমার কারণেই হয়েছে।"
-"আচ্ছা যাই হোক আমার জন্য একটা আইসক্রিম নিয়ে আয়। আফটার অল তুই আমার অকাজের এসিস্ট্যান্ট।"
সানা আইসক্রিম হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে তার আট তলায় থাকা নতুন কেবিনের উদ্দেশ্যে। তারা ভিআইপি এলিভেটরের সামনে দাঁড়িয়ে প্রেস করতেই সাথে সাথে লিফট খোলে যায়।
ভিতরে থাকা আরজে চোখ তুলে তাকাতেই চোখাচোখি হয় সানা আর এসপির সাথে। এসপির চোখ বড় বড় হয়ে যায় বিড়বিড় করে বলে ওঠে,
-"ওহ শিট, এসপি আজ তো গায়া কামসে"
সামনে থাকা আরজের দেহে এক মুহূর্তের জন্য শীতল ধাক্কা অনুভব করল। সবকিছু যেন হঠাৎ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল। মুহূর্তে ছোঁয়াল শক্ত হয়ে এলো তার। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ভেতরের আগ্নেয়গিরি সংবরণের যথাসাধ্য চেষ্টায় আরজে। সে নিজেই নিজেকে বোঝালো 'এটা পাবলিক প্লেস'। এদিকে সানা একটা শুকনো ঢোক গিলে মেকি হাসি দিয়ে বলে,
-" লিফট্ ফুল্, আমরা নেক্সটে...."
তার বাক্য সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে আরজে চোখ তুলে তাকালো তার দুপাশে, সাথে সাথে আয়ান ছাড়া সবাই বেরিয়ে পড়ে। সানা আর এসপি দ্বিধা দ্বন্দের মধ্যেই ঢুকে পড়ে। মুহূর্তে লিফট ক্লোজ হয়ে যায়।
আরজের চোখ দুটো অন্ধকারে ডুবে গেল। তার ইচ্ছা করছে এই মুহূর্তে এই ছেলের নাকশি পাটাতে। আর এক মুহূর্তে না দাঁড়িয়ে হঠাৎ এসপিকে ধাক্কা দিয়ে সাইডে সরিয়ে দিল। দাড়িয়ে যায় সানার একদম গাঁ ঘেঁষে। সানার এদিকে খেয়াল নেই। সে একমনে ভেবেই চলছে 'এখান থেকে কীভাবে বাঁচা সম্ভব, উপরওয়ালা এবারের মতো বাচিয়ে দিলে আমি দুই টাকা দান করব নিজের পকেট থেকে'
অন্যদিকে এসপি আকষ্মিক আক্রমণে দেওয়ালের সাথে ধাক্কা খায়। সে নিজেকে সামলে কিছু বলার আগেই ভেসে আসে আরজের গম্ভীর রুক্ষ কণ্ঠস্বর,
-''আমার অক্সিজেন আসছে না"
পিছনে থাকা বেচারা আয়ান বুঝল না আরজের কথা। সে অবুঝ স্বরে বলে ওঠে,
-"স্যার লিফটে অক্সিজেন আসবে কোথা থেকে?"
আরজের মাথায় অলরেডি রক্ত চেপে আছে। তার ওপর এটা, তার ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে একে নিচে ফেলে দিতে, সবাই 'ঘর শত্রু বিভীষণ'
আরজে তার দিকে কটমট দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই আয়ান চুপ হয়ে যায়। সে এবার এসপির দিকে অগ্নিঝরা চাহনিতে তাকায়, এসপি মুখে মেকি হাসি টেনে বলে ওঠে,
-"হোয়াট আ সার...."
তার বাক্য সম্পন্ন হওয়ার আগেই আরজে হাত উচিঁয়ে থামিয়ে দিলো। নিজের দন্তপাটি পিষে বলে ওঠে,
-"হোয়াট আ সারপ্রাইজ, বিগ ফ্যান ব্রো। এটুকু আমি জানি। কিন্তু তুমি কি জানো সি ইজ ম্যারিড"
এসপি নিজের চিরাচরিত রূপে ফিরে আসে,
-"হ্যাঁ শুরু থেকেই"
আরজে এবার আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। এসপির জবাব তাকে আরও অস্থির করে তুললো। আরজের বুকে রাগ তরতর করে বেড়ে উঠছে। হাতে থাকা শিরাগুলো টানটান, চোয়াল শক্ত, দৃষ্টিতে বিষাদ আর হিংস্রতা। একটানে এসপির কলার টেনে ধরে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে,
-"একটা ম্যারিড মেয়ের পিছনে পড়তে তোমার লজ্জা করেনি"
এসপি নিজের কলার ছাড়াতে ছাড়াতে বললো,
-"দেখুন মিস্টার জাওয়ান, আমরা শুধু ফ্রেন্ড,আর..."
তার বাক্য না শুনেই আরজে তার কলা ছেড়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
-"দুটো অপশন, খু*ন হতে চাস নাকি কিড*ন্যাপ"
এসপি শক্ত কণ্ঠে মুখ খুলে কিছু বলার আগেই কাঙ্খিত ফ্লোরে এসে লিফট খুলে যায়। প্রথমে আয়ান বেরিয়ে পড়ে। এই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে সে নেই। তারপর এসপি বের হয়। সানা বের হওয়ার জন্য এক পা দিয়ে আরেক পা বের করার আগেই আরজে একটানে তাকে লিফটের ভিতর ঢুকিয়ে লিফটের সর্বোচ্চ বাটনে প্রেস করে দেয়। লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার আগেই সানার হাতে থাকা আইসক্রিমটা নিয়ে বাইরের দিকে ছুড়ে ফেলে দেয়। এটা গিয়ে পড়ে এসপির ড্রেসে। ঘটনা এত দ্রুত ঘটে যে কারো বোধগম্য হলো নাহ।এসপি বুঝতেই লিফটের দড়জায় গিয়ে আঘাত হানে,
-"এ.....এ..এ জাওরা দরজা খোল।"
সাথে কয়েকটা গা*লি ছুড়তে থাকে আরজের দিকে।
পাশে থাকা আয়ানের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। এই ইঁচড়েপাকা ছেলে কাকে জাওরা বলেছে। যদিও ঠিক নামেই ডেকেছে তারপরও স্যার শুনতে পারলে এই ছেলের সানডে মানডে ক্লোজ করে ফেলবে। সে গলা খাঁকারি দিয়ে হাত বাড়িয়ে বলে ওঠে,
-"দেখ ছেলে আমাদের পরিচয় হয়নি, আমি আয়ান"
এসপি তার দিকে বিরক্তি সূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে,
-"তো আমি কি করবো, মিষ্টি বিতরণ করব নাকি, আজব"
এই বলে এসপি সামনের দিকে পা বাড়ায়। তাকে ড্রেস পরিষ্কার করতে হবে।
এদিকে আয়ান হতবিহহবল হয়ে নিজের হাত গুটিয়ে নিয়ে ভাবছে,
'এই ইঁচড়েপাকা ছেলে কি আমায় অপমান করলো, হ্যাঁ তাইতো মনে হল। দাঁতে দাঁত পিষে গর্জে উঠে, "এই ছেলের সানডে মানডে আমি ক্লোজ করবো। এখন দেখতে হবে স্যার কোন ফ্লোরে বসে রোমাঞ্চ করছে। আমি বিগড়ে দিতে আসছি..স্যাররর....."
_______________________
আরজে সানার দুই হাত মুঠো বন্দি করে লিফটের সাথে চেপে ধরে। তার চোখে মুখে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছে। একে তো সানা তাকে মিথ্যা বলেছে তার উপর এই ছেলের সাথে। এদিকে সানা উপরে নিজেকে যথেষ্ট স্বাভাবিক প্রকাশ করলেও ভিতরে ভিতরে একটু ভয়ে আছে, সে একা বদ্ধ লিফটে। ভেসে এলো আরজের রুক্ষ গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
-"So wifey, is it your varsity?"
সানা একটু সময় নিয়ে বলে ওঠে,
-"হ্যাঁ ডিজিটাল ভার্সিটি"
আরজের পছন্দ হলো না তার জবাব,
-"আচ্ছা তাই নাকি"
-"হ্যা, লাইক ভার্সিটি প্রোম্যাক্স"
আরজের কপালের ভাঁজ গাঢ় হয়,
-"মানে!"
সানা মনে মনে নিজের অতিপরিচিত ডায়লগটা মনে করে,
-"লোকে 'আ' বললে...
আরজে নিজের হাত দিয়ে সানার মুখ চেপে ধরে নিজেদের মধ্যকার দূরত্ব টুকু ঘুচিয়ে নিলো। তার কণ্ঠস্বর নিম্ন, দমিত, কিন্তু গভীর অগ্নিগহ্বরের মতো গর্জমান,
-"লোকে 'আ' বললে 'আখাউড়া' বুঝে ফেলে বাট তুমি ভার্সিটি বলেছো আর আমি ভার্সিটি প্রোম্যাক্স এর মানে বুঝিনি। এখন তুমি আমাকে ভালো করে বুঝাবে প্রোম্যাক্সের মাঝে ওই ভাইরাসটা কি করছে।"
__________________________
আরজে সারহাদের কেবিন থেকেই বেরুতেই তার নজরে আসে সানা আর এসপি। সানা সিরিয়াস ভাবে একটা জামার ডিজাইন করছে অদূরে দাঁড়িয়ে, হাতে তার কাঁচি আর ফিতা। আর এসপি তার চেয়ারে বসেই টেবিলে পা তুলে ভিডিও গেমস খেলছে। কিন্তু কেন জানি আরজের তা সহ্য হচ্ছে না। সে তাদের দিকে এগিয়ে যেতেই আয়ান তাকে আটকায়,
-"স্যার কি করছেন এটা পাবলিক প্লেস"
রেগে গেল আরজে,
-"বউ চলে গেলে পাবলিক আমার বউ এনে দেবে। আমি কিছু জানি না, আমি পার্কিংলটে আছি পাঁচ মিনিটে ওকে বলবে আসতে। না হলে তোমার খবর করবো আমি"
আরজে আয়ান কে চোখ রাঙিয়ে চলে যায়। বেচারা আয়ান করুন সুরে বলে উঠে,
-"এবার তো মনে হচ্ছে আমার সানডে মানডে ক্লোজ হয়ে যাবে"
-চলবে....
