Cherreads

Chapter 1 - The Whispering Forest

ফিসফিস করা বন (The Whispering Forest)

পৃষ্ঠা ১ – গ্রাম ও নিষিদ্ধ বন

অনেক দিন আগে সবুজ পাহাড়ে ঘেরা একটি শান্ত উপত্যকার পাশে ছিল একটি ছোট গ্রাম। গ্রামের নাম ছিল এলমরিজ। গ্রামের মানুষ খুব সাধারণ জীবন যাপন করত। তারা জমিতে চাষ করত, পশু পালন করত এবং প্রতি সন্ধ্যায় আগুনের পাশে বসে গল্প করত।

কিন্তু তাদের সব গল্প সুখের ছিল না।

গ্রামের উত্তরে ছিল একটি ঘন ও অন্ধকার বন। সেই বন এত পুরোনো ছিল যে সূর্যের আলোও ঠিকমতো মাটিতে পৌঁছাত না। গাছগুলো ছিল খুব লম্বা এবং বাঁকা, যেন তাদের ডালপালা আকাশের দিকে কঙ্কালের আঙুলের মতো ছড়িয়ে আছে।

গ্রামের মানুষ সেই বনের নাম দিয়েছিল ফিসফিস করা বন।

কেউ সেখানে যেতে সাহস করত না।

তাদের বিশ্বাস ছিল যে বনটি অভিশপ্ত। কেউ কেউ বলত রাতে তারা বনের ভেতর থেকে অদ্ভুত ফিসফিস শব্দ শুনতে পায়। আবার কেউ বলত তারা গাছের ফাঁকে অদ্ভুত ছায়া নড়াচড়া করতে দেখেছে।

গ্রামের বাবা–মায়েরা তাদের সন্তানদের বারবার সতর্ক করত—

"সূর্য ডোবার পরে কখনো ওই বনের কাছে যেও না।"

বেশিরভাগ শিশুই সেই কথা মানত।

কিন্তু একজন ছেলে ছিল আলাদা।

তার নাম ছিল আরিন।

পৃষ্ঠা ২ – কৌতূহলী ছেলে

আরিন পুরো গ্রামে তার কৌতূহলের জন্য পরিচিত ছিল। অন্য বাচ্চারা যখন ভূতের গল্প শুনে ভয় পেত, আরিন তখন সেই গল্প শুনতে খুব পছন্দ করত।

সে এমন অনেক প্রশ্ন করত যার উত্তর কেউ দিতে পারত না।

"বনটা কেন ফিসফিস করে?"

"বনের ভেতরের পুরোনো কুয়োটা কে বানিয়েছিল?"

"আসলেই কি আত্মা বলে কিছু আছে?"

গ্রামের বয়স্করা মাথা নেড়ে বলত—

"সব রহস্যের উত্তর জানা দরকার নেই।"

কিন্তু আরিন মনে করত, ভয় পাওয়া সত্য খুঁজে না পাওয়ার কারণ হতে পারে না।

তার দিদা মীরা মাঝে মাঝে তার প্রশ্নের উত্তর দিতেন। তিনি খুব জ্ঞানী ছিলেন এবং অনেক পুরোনো গল্প জানতেন।

এক ঝড়ো রাতে আগুনের পাশে বসে আরিন জিজ্ঞেস করল—

"দিদা, ওই ফিসফিস করা বনটা কি সত্যিই অভিশপ্ত?"

মীরা কিছুক্ষণ আগুনের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলেন।

তারপর ধীরে বললেন—

"কিছু জায়গায় এমন গোপন রহস্য থাকে, যেগুলো লুকিয়েই থাকা ভালো।"

আরিন একটু সামনে ঝুঁকে বলল—

"কিন্তু যদি কেউ সাহস করে সত্যটা খুঁজে বের করে?"

মীরা তার দিকে চিন্তিত চোখে তাকালেন।

"সাহস আর বোকামির মাঝে অনেক সময় খুব কম পার্থক্য থাকে।"

পৃষ্ঠা ৩ – রাতের ফিসফিস

কয়েক দিন কেটে গেল, কিন্তু আরিনের মাথা থেকে বনের কথা সরল না।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে গ্রামের বাইরে দাঁড়িয়ে দূরের উঁচু গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকত।

তারপর এক রাতে অদ্ভুত কিছু ঘটল।

আরিন হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠল।

বাইরে বাতাস জোরে বইছিল। জানালার কাঁচ কাঁপছিল, গাছের পাতা শব্দ করছিল।

কিন্তু বাতাসের শব্দের মাঝেও সে আরেকটা শব্দ শুনল।

একটা ফিসফিস।

খুব ক্ষীণ।

"এসো…"

আরিন বিছানায় উঠে বসল।

তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

আবার সেই ফিসফিস শোনা গেল—

"এসো… সত্যটা খুঁজে বের করো…"

আরিন জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দূরে চাঁদের আলোয় বনের কালো ছায়া দেখা যাচ্ছিল।

ফিসফিসটা যেন সেখান থেকেই আসছিল।

সেই মুহূর্তেই আরিন সিদ্ধান্ত নিল।

সে বনের ভেতরে যাবে।

পৃষ্ঠা ৪ – অন্ধকারে প্রবেশ

পরের দিন সন্ধ্যায় আরিন তার যাত্রার প্রস্তুতি নিল।

সে একটি ছোট লণ্ঠন নিল, রান্নাঘর থেকে একটু লবণ নিল এবং কিছু খাবার নিল। তার দিদা বলতেন লবণ নাকি খারাপ আত্মা থেকে রক্ষা করে।

"যদি দরকার হয়," সে নিজেই বলল।

চুপচাপ বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে গ্রামের উত্তরের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

বনের কাছে আসতেই বাতাস ঠান্ডা হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পরে গ্রামের শেষ বাড়িটাও তার পিছনে মিলিয়ে গেল।

সামনে দাঁড়িয়ে ছিল বিশাল গাছের সারি।

আরিন এক মুহূর্ত থেমে গেল।

সব গল্প যেন তাকে ফিরে যেতে বলছিল।

কিন্তু তার কৌতূহল তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেল।

গভীর শ্বাস নিয়ে সে বনের ভেতরে ঢুকে পড়ল।

পৃষ্ঠা ৫ – যে বন তাকিয়ে থাকে

বনের ভেতরে ঢুকেই আরিন বুঝতে পারল জায়গাটা অন্যরকম।

হাওয়া ভারী এবং ঠান্ডা।

উপরে ডালপালা এত ঘন ছিল যে চাঁদের আলো প্রায় মাটিতে পৌঁছাচ্ছিল না।

লণ্ঠনের আলোতে চারপাশের গাছগুলো অদ্ভুত লাগছিল।

হঠাৎ…

সে শুনল।

একটা ফিসফিস।

"ফিরে যাও…"

আরিন থেমে গেল।

ফিসফিসটা আবার শোনা গেল—

"এখনও সময় আছে…"

তার বুক জোরে ধড়ফড় করতে লাগল।

তবুও সে ধীরে ধীরে আরও ভেতরে হাঁটতে লাগল।

পৃষ্ঠা ৬ – পুরোনো পাথরের কুয়ো

অনেকক্ষণ হাঁটার পরে সে একটি ছোট ফাঁকা জায়গায় পৌঁছাল।

সেখানে মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল একটি পুরোনো পাথরের কুয়ো।

কুয়োর গায়ে অদ্ভুত কিছু চিহ্ন খোদাই করা ছিল।

চিহ্নগুলো হালকা নীল আলোতে জ্বলছিল।

আরিন ধীরে ধীরে কাছে গেল।

সে আগে কখনো এমন লেখা দেখেনি।

কুয়োর কাছে আসতেই বাতাস আরও ঠান্ডা লাগছিল।

সে কুয়োর ভেতরে তাকাল।

হঠাৎ ভিতর থেকে এক ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে এল।

লণ্ঠনের আলো কাঁপতে লাগল।

তারপর অন্ধকার থেকে একটা ছায়া ধীরে ধীরে উপরে উঠতে লাগল।

পৃষ্ঠা ৭ – আত্মার আবির্ভাব

একটি ফ্যাকাশে আকৃতি কুয়োর উপরে ভেসে উঠল।

তার চোখে অদ্ভুত আলো জ্বলছিল।

তার কণ্ঠস্বর ঠান্ডা বাতাসের মতো শোনাচ্ছিল।

"অনেক দিন ধরে অপেক্ষা করছি… এমন একজনের জন্য যে সাহস করে এখানে আসবে।"

আরিন পিছিয়ে গেল।

"তুমি… কে?"

আত্মাটি ধীরে ভেসে কাছে এল।

"একশ বছর ধরে আমি এখানে বন্দি।"

তার চোখ আরিনের দিকে স্থির হয়ে গেল।

"এই কুয়োর চিহ্নটা ভেঙে দাও… তাহলে আমি মুক্তি পাব।"

আরিন কুয়োর দিকে তাকাল।

চিহ্নগুলো অদ্ভুত আলোতে জ্বলছিল।

কিন্তু কিছু একটা ঠিক মনে হচ্ছিল না।

পৃষ্ঠা ৮ – সতর্কবার্তা

আরিন যখন কুয়োর কাছে এগিয়ে গেল, তখন চারপাশের ফিসফিস শব্দ আরও জোরে হয়ে উঠল।

হঠাৎ বনের ভেতর থেকে আরেকটি কণ্ঠস্বর শোনা গেল—

"ওটা ভেঙো না!"

আরিন দ্রুত পিছনে তাকাল।

কেউ নেই।

কিন্তু কণ্ঠস্বর আবার শোনা গেল—

"ওটা কারাগার নয়।"

"ওটা একটি সীল।"

আরিনের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে বুঝতে পারল সত্যটা।

আত্মার মুখ ভয়ংকর রাগে বিকৃত হয়ে গেল।

"তুমি এটা জানার কথা ছিল না!"

পৃষ্ঠা ৯ – ভয়ংকর সত্য

আত্মাটি চিৎকার করে উঠল।

গাছগুলো যেন কাঁপতে লাগল।

"সীলটা ভেঙে দাও!"

কিন্তু এখন আরিন বুঝে গেছে।

চিহ্নগুলো আত্মাটাকে আটকে রাখার জন্য নয়।

বরং পৃথিবীকে তার থেকে রক্ষা করার জন্য।

তার দিদার কথা মনে পড়ল।

কিছু রহস্য লুকিয়েই থাকা ভালো।

কাঁপা হাতে সে পকেট থেকে লবণের থলিটা বের করল।

সে কুয়োর চারপাশে লবণ ছড়াতে লাগল।

আত্মাটি ভয়ংকর চিৎকার করল।

"না!"

কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।

কুয়োর চিহ্নগুলো হঠাৎ উজ্জ্বল আলোতে জ্বলে উঠল।

আত্মাটি এক ভয়ংকর চিৎকার করে অদৃশ্য হয়ে গেল।

পৃষ্ঠা ১০ – শেষ ফিসফিস

বন আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

বাতাস থেমে গেল।

গাছগুলো স্থির দাঁড়িয়ে রইল।

আরিন কিছুক্ষণ ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর লণ্ঠন তুলে সে গ্রামের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

ভোর হওয়ার সময় সে বাড়িতে ফিরে এল।

সে কাউকে কিছু বলেনি।

এমনকি তার দিদাকেও না।

কিন্তু মাঝে মাঝে গভীর রাতে…

যখন বাতাস বনের ভেতর দিয়ে বয়ে যায়…

আরিন এখনও একটি ক্ষীণ ফিসফিস শুনতে পায়—

"পরের বার…"

"আমি মুক্ত হব…"

আর গভীর সেই বনের অন্ধকারে…

কিছু একটা এখনও অপেক্ষা করছে।

More Chapters