Cherreads

Chapter 1 - Ch1

Ami akta golpo likhchi

গল্পের নাম: "অক্ষরহীন ডায়েরি ও শেষ বিকেলের কারিগর"

১. প্রেক্ষাপট

শহরটা আর পাঁচটা সাধারণ শহরের মতো নয়। এখানে মানুষের আয়ু নির্ধারিত হয় তার 'স্মৃতি' দিয়ে। যার স্মৃতি যত মধুর, সে তত দীর্ঘজীবী। আর যার স্মৃতি তিক্ত বা দুঃখে ভরা, তার শরীর ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে মিলিয়ে যায়। এই শহরে বাস করে অয়ন, যাকে সবাই চেনে 'স্মৃতি-কারিগর' হিসেবে। অয়ন মানুষের মস্তিষ্ক থেকে খারাপ স্মৃতিগুলো মুছে দিয়ে সেখানে কৃত্রিম সুন্দর স্বপ্ন বসিয়ে দেয়।

২. গল্পের শুরু

একদিন অয়নের কাছে এক বৃদ্ধা এলেন। তার নাম মায়া দেবী। মায়া দেবীর হাতে ছিল একটি সাদা ডায়েরি, যার প্রতিটা পাতা শূন্য—কোনো অক্ষর নেই। মায়া দেবী বললেন, "অয়ন, লোকে তোমার কাছে আসে ভুলে যেতে। কিন্তু আমি এসেছি মনে করতে। আমার এই ডায়েরিতে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যিটা লেখা ছিল, যা এখন অদৃশ্য হয়ে গেছে। আমি চাই তুমি আমার স্মৃতিগুলো খুঁড়ে সেই সত্যিটা বের করো।"

অয়ন অবাক হলো। কারণ সে স্মৃতি মোছার কারিগর, স্মৃতি ফিরিয়ে আনার নয়। তবুও কৌতূহলবশত সে মায়া দেবীর মাথায় তার 'মেমোরি ট্রান্সমিটার' যন্ত্রটি বসালো।

৩. রহস্যের উন্মোচন

অয়ন যখন মায়া দেবীর স্মৃতির গভীরে প্রবেশ করল, সে দেখল এক অদ্ভুত দৃশ্য। মায়া দেবীর জীবনে কোনো বড় দুর্ঘটনা নেই, কোনো বিচ্ছেদ নেই। বরং তার জীবন ছিল অস্বাভাবিক রকমের নিখুঁত। কিন্তু সমস্যাটা সেখানেই। মায়া দেবীর স্মৃতিগুলো সব 'অর্ডার করা'। অর্থাৎ, কেউ একজন আগে থেকেই তার সব খারাপ স্মৃতি মুছে দিয়ে সেখানে শুধু সুখের স্মৃতি ভরে রেখেছে।

স্মৃতির অলিগলি ঘুরতে ঘুরতে অয়ন একটি বন্ধ দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। সেই দরজার ওপাশে ছিল মায়া দেবীর আসল পরিচয়। অয়ন আবিষ্কার করল, মায়া দেবী আসলে কেউ নন—তিনি ছিলেন অয়নেরই হারিয়ে যাওয়া মা।

৪. ড্রামাটিক মোড় (The Twist)

২০ বছর আগে, অয়ন যখন ছোট ছিল, তাদের পরিবারে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। সেই আগুনে অয়নের বাবা মারা যান এবং অয়ন মারাত্মকভাবে আহত হয়। মায়া দেবী সহ্য করতে পারছিলেন না ছেলের এই কষ্ট। তাই তিনি তৎকালীন এক স্মৃতি-কারিগরের কাছে গিয়ে নিজের জীবনের সমস্ত 'দুঃখের স্মৃতি' এবং 'অয়নের পরিচয়' দান করে দিয়েছিলেন, যাতে অয়ন সুস্থ হয়ে এক নতুন জীবন পায়।

বিনিময়ে মায়া দেবী নিজে হারিয়ে ফেলেন তার পরিচয়। তিনি হয়ে যান এক ভবঘুরে বৃদ্ধা, যার ডায়েরির পাতাগুলো সাদা। কারণ সেই ডায়েরিতে অয়নের শৈশবের কথা লেখা ছিল, যা তিনি নিজেই মুছে ফেলার অনুমতি দিয়েছিলেন।

৫. ক্লাইম্যাক্স

অয়ন যখন এই সত্যটা জানতে পারল, তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। সে যাকে এতদিন সাধারণ এক গ্রাহক ভাবছিল, সে-ই তার অস্তিত্বের উৎস। মায়া দেবী তখন অয়নের হাত ধরে বললেন, "আমি কিছুই মনে করতে পারছি না অয়ন, কিন্তু আমার ডায়েরির এই সাদা পাতাগুলো কেন জানি তোমাকে দেখে কাঁদছে।"

অয়ন বুঝতে পারল, সে যদি মায়া দেবীর স্মৃতি ফিরিয়ে দেয়, তবে মায়া দেবী আবার সেই ভয়াবহ আগুনের কষ্ট এবং স্বামীর মৃত্যুর শোক ফিরে পাবেন। আর স্মৃতি ফিরিয়ে না দিলে মায়া দেবী মারা যাবেন, কারণ তার বর্তমান 'কৃত্রিম স্মৃতি' ফুরিয়ে আসছে।১. নীল কুয়াশার শহর

শহরটার নাম 'স্মৃতিপুর'। নামটা শুনলে মনে হয় কোনো রূপকথার দেশ, কিন্তু এখানকার বাস্তব বড়ই নির্মম। এই শহরের আকাশ সবসময় হালকা নীল কুয়াশায় ঢাকা থাকে। এখানকার মানুষ হাসে কম, ভাবে বেশি। কারণ, এই শহরে মানুষের আয়ু ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়, বরং তাদের স্মৃতির গভীরতায় মাপা হয়।

স্মৃতিপুর কর্পোরেশনের নিয়ম অনুযায়ী, যার মস্তিষ্কে যত বেশি 'বিশুদ্ধ সুখের স্মৃতি' থাকবে, তার হৃদস্পন্দন তত বেশিদিন সচল থাকবে। আর যাদের জীবনে কেবল দুঃখ, গ্লানি বা অপরাধবোধের স্মৃতি জমেছে, তাদের শরীর ধীরে ধীরে কাঁচের মতো স্বচ্ছ হয়ে আসে। একে বলা হয় 'ফেডিং' বা মিলিয়ে যাওয়া।

এই শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত গলিটির শেষ মাথায় একটি ছোট দোকান। সাইনবোর্ডে লেখা—"—"স্মৃতি-শালা: শেষ বিকেলের কারিগর"। এখানকার মালিক অয়ন। বয়স ত্রিশের কোঠায়, কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে যেন হাজার বছরের ক্লান্তি। অয়ন একজন 'মেমোরি সার্জন'। সে মানুষের মস্তিষ্ক থেকে বিষাক্ত স্মৃতিগুলো নিখুঁতভাবে কেটে বাদ দেয় এবং সেখানে উজ্জ্বল, রঙিন কৃত্রিম স্মৃতি প্রতিস্থাপন করে।

অয়ন জানে সে যা করছে তা এক ধরণের প্রতারণা। কিন্তু মানুষ বাঁচতে চায়। এক মুহূর্তের মিথ্যে সুখের জন্য তারা তাদের সারাজীবনের সত্যিটা বিসর্জন দিতে রাজি।

৬. উপসংহার

অয়ন এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিল। সে তার নিজের জমানো সমস্ত 'সুখের স্মৃতি' মায়া দেবীর মস্তিষ্কে ট্রান্সফার করে দিল। এর ফলে অয়ন নিজে তার স্মৃতি হারিয়ে এক সাধারণ মানুষে পরিণত হলো, কিন্তু মায়া দেবী ফিরে পেলেন তার হারানো ছেলেকে চেনার ক্ষমতা।

গল্পের শেষে দেখা যায়, এক বৃদ্ধা এবং এক যুবক সমুদ্রের পাড়ে বসে আছে। যুবকটির কিছুই মনে নেই, সে কেবল একদৃষ্টিতে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। আর বৃদ্ধাটি পরম মমতায় তার হাতে থাকা ডায়েরির সাদা পাতায় নতুন করে লিখতে শুরু করেছেন—"আজ আমার ছেলের পুনর্জন্ম হলো।"

More Chapters