বিকেলের শেষ আলোটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। গ্রামের সরু রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রাফি বহু বছর আগের স্মৃতিগুলো মনে করার চেষ্টা করছিল।
এই গ্রামেই তার শৈশব কেটেছে। কিন্তু পড়াশোনা আর কাজের কারণে শহরে চলে যাওয়ার পর আর এখানে ফেরা হয়নি।
আজ প্রায় দশ বছর পরে সে আবার ফিরে এসেছে।
রাস্তার শেষে একটা পুরনো বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িটার দেয়াল কিছুটা ভেঙে গেছে, জানালাগুলো ধুলোয় ঢাকা।
এটাই রাফিদের পুরনো বাড়ি।
বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে রাফির মনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
মনে হলো—এই বাড়িটা যেন অনেকদিন ধরে তার জন্য অপেক্ষা করছিল।
রাফি ধীরে ধীরে দরজার তালা খুললো।
দরজা খুলতেই ভেতর থেকে ধুলো আর পুরনো কাঠের গন্ধ বেরিয়ে এলো।
ঘরের ভেতর সবকিছু আগের মতোই আছে—পুরনো টেবিল, একটা কাঠের আলমারি, আর দেয়ালে ঝুলানো কিছু ছবি।
দেয়ালের একটা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে রাফি থেমে গেল।
ছবিটা তার দাদার।
তার দাদা এই গ্রামের খুব সম্মানিত মানুষ ছিলেন। ছোটবেলায় দাদা তাকে অনেক গল্প শুনাতেন—এই গ্রামের ইতিহাস, পুরনো ঘটনা, আর কিছু অদ্ভুত রহস্যের গল্প।
তখন রাফি সেগুলোকে শুধু গল্পই মনে করতো।
কিন্তু আজ এই বাড়িতে ফিরে এসে সেই গল্পগুলো আবার মনে পড়ছে।
রাফি ঘর পরিষ্কার করতে শুরু করলো।
টেবিলের ওপর জমে থাকা ধুলো মুছতে মুছতে হঠাৎ তার চোখে পড়লো একটা ছোট কাঠের বাক্স।
বাক্সটা আগে কখনো দেখেনি সে।
কৌতূহল নিয়ে বাক্সটা খুলতেই সে ভেতরে একটা পুরনো ডায়েরি দেখতে পেল।
ডায়েরিটার কভার অনেকটা ছিঁড়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে অনেক পুরনো।
রাফি ডায়েরিটা খুললো।
প্রথম পাতায় লেখা—
"এই ডায়েরি আমি লিখছি এমন কিছু ঘটনার জন্য, যা হয়তো একদিন কেউ বিশ্বাস করবে না।"
রাফির বুকের ভেতর কেমন যেন ধুকপুক করতে লাগলো।
সে পরের পাতাটা খুললো।
সেখানে লেখা ছিল—
"এই গ্রামের পাশে যে পুরনো জায়গাটা আছে, সেখানে মাঝরাতে অদ্ভুত একটা আলো দেখা যায়। বহু বছর ধরে মানুষ এটা দেখছে, কিন্তু কেউ জানে না সেটা কী।"
রাফি একটু থেমে গেল।
সে জানালার দিকে তাকালো।
বাইরে তখন অন্ধকার নেমে এসেছে।
হঠাৎ দূরের মাঠের দিকে তাকিয়ে সে অবাক হয়ে গেল।
দূরে কোথাও একটা মৃদু আলো জ্বলছে।
রাফি চোখ কচলালো।
আলোটা সত্যিই আছে।
তার মনে পড়লো ডায়েরির কথাটা।
"মাঝরাতে অদ্ভুত আলো দেখা যায়…"
রাফির মনে হঠাৎ একটা প্রশ্ন জেগে উঠলো—
এই আলোটা কি সেই একই আলো?
সে জানতো না।
কিন্তু একটা জিনিস সে বুঝতে পারলো—
এই গ্রামে এমন কিছু রহস্য আছে, যা এখনো কেউ জানে না।
আর সেই রহস্যের শুরুটা হয়তো এই পুরনো ডায়েরি থেকেই।
ঘরের ভেতর আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
রাফি ধীরে ধীরে ডায়েরিটা বন্ধ করলো।
তার চোখে তখন কৌতূহল আর একটু ভয়।
সে জানতো না সামনে কী অপেক্ষা করছে।
কিন্তু একটা ব্যাপার নিশ্চিত—
তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের শুরুটা হয়ে গেছে।
(চলবে — পর্ব ২: রহস্যময় ডায়েরি)
