#পর্বসংখ্যা১৯
#হ্রদয়ামিলন
#Shavakhan
পুরো কক্ষ জুরে নীরবতায় ছেয়ে রয়েছে। কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেও এসপির দিকে তাকিয়ে আছে এক জোড়া তীক্ষ্ণ চাহনির চোখ। এদিকে এসপি মনে মনে সকল দুয়া দুরুদ পড়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রয়োজনের সময় 'ইন্নানিল্লাহ' ছাড়া আর কিছুই যেন মনে আসছে না। অলরেডি খুশদিল ফারুকী গত আধাঘন্টা ধরে তাকে লেকচার দিয়েছে, তার লাইফ শেষ, সে আওয়ারা গিরি ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না, এভাবে আর কত কি। তারপর নীরবতা, পাক্কা দশ মিনিট অতিবাহিত হওয়ার পর খুশদিল আবার নিজের মহামূল্যবান বাক্য খানা ছুড়লেন এসপির দিকে,
-"এবার এটা বলো হাজার নিষেধ থাকা সত্ত্বেও তুমি আমার মেয়ের পিছু ছাড়বে না, তাই না?"
এসপির চোখ বড় বড় হয়ে যায়। মনে মনে ভাবছে, 'বলছে কি এই হরপ্পা মামা, আমার পেছনে মেয়েদের লাইন আর আমি নাকি ওনার.....' এসপির ভাবনার সুতা টেনে ধরে আবার বাক্য আওড়ালেন খুশদিল ফারুকী,
-"সানিতা এই বাড়িতে তিন মাস থাকবে। আর আমি চাইনা এই তিন মাস তুমি এ বাড়িতে থাকো। প্রয়োজন হলে আমি তোমাকে ছোটখাটো ফ্ল্যাট খুঁজে দেবো, তুমি ওখানেই শিফট্ হয়ে যাবে এ কদিনের জন্য।"
এসপির ইচ্ছা করছে এই বাড়ির দলিল এনে দেখাতে, ওখানে তার বিখ্যাত নামটাও লেখা আছে। আর এই হরপ্পা মামা তাকে বলছে তার বাড়ি থেকেই চলে যেতে। কিন্তু তার মাথায় হঠাৎ একটা বুদ্ধি আসলো, এটাই সুযোগ পেপে দিয়ে চেপে দেওয়ার।
-"ওকে আমি রাজি, তবে আমার ফ্ল্যাট ঠিক করা আছে। আপনি ওটাই দিলে আমি চলে যাব।"
-"বাহ লাইফেও তো কোন কাজ এক কথায় করোনি হঠাৎ একবারেই রাজি হয়ে গেলে। মতলব কী?"
এসপির ইচ্ছা করছে, নিজের মাথায় নিজে দুটো বারি দিতে। কথা শুনলেও দোষ না শুনলেও দোষ।
ভেসে এলো আবার খুশদিল ফারুকীর কণ্ঠ,
-"যাই হোক তুমি যখন চাইছো এখন বলো কোথাকার চাই?"
-"গুলশান আট, ব্লক তিনের প্লটে"
-"তুমি এত দামি ফ্ল্যাট দিয়ে কি করবে, আচ্ছা যাই হোক কাল পেয়ে যাবে"
এই বলে তিনি বেরোনোর আগেই সানিতা আসে,হাতে এক বাটি পায়েস।
-"পাপা তুমি এখানে, আর আমি তোমাকে পুরো বাড়িতে খুজছিলাম"
ভদ্রলোক যেমন গোছের মানুষই হন না কেন মেয়ের কাছে বেস্ট। খুশদিল শীতল কন্ঠে শুধালেন,
-"পাপাকে কেন খুঁজছিলেন মামনি"
সানিতা এসপিকে একটা হাসি উপহার দিয়ে তাকায় যে এই মুহূর্তে দিন দুনিয়া ভুলে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সানিতা নিজের চোখ ফিরিয়ে খুশদিলের দিকে একটু এগিয়ে এসে বলল,
-"দেখনা আমি ফার্স্ট টাইম কিছু বানিয়েছি"
-"আচ্ছা তাই নাকি, দেখি পাপা কেমন হয়েছে?"
এসপি ঠিক এই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিল। মনে মনে একটা ক্রুর হাসি দিয়ে খুশদিলের দিকে তাকায়। খুশদিল মাত্র এক চামচ মুখে তুলে আর গিলতে পারছেন না। উনার চোখ বড় বড় হয়ে গিয়েছে। একে পায়েসের 'প' বলে কি না ওনার সন্দেহ। এসপি এগিয়ে এসে সানিতার হাত থেকে বাটিটা নিয়ে বলে ওঠে,
-''কি হলো মামা ভালো হয়নি বুঝি? নিন না আরেকটু নিন।"
ভদ্রলোক মেয়ের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারছেন না। এদিকে গিলতেও পারছে না,তাই এসপির দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে মাথার দু দিকে নেড়ে না বোঝাচ্ছেন, আর মেয়ের দিকে তাকিয়ে মাথা উপরে নিচে হেলিয়ে 'হ্যা' বোঝাচ্ছেন।
পাশ থেকে সানিতা বলে ওঠে,
-"ওকে তাহলে পুরোটা তোমার জন্য"
এসপি আরো এক চামচ নিয়ে উনার মুখের সামনে ধরে। উনি ভালো মতেই বুঝতে পারছে এই ছেলে ওনার মজা নিচ্ছে। বাধ্য হয়ে উনি পুরোটা সাবাড় করার পরই সানিতা চলে যায়। উনি এক দৌড়ে বাথরুমে চলে যান। এদিকে এসপির পেট ফেটে হাসি আসছে। সে আর দাঁড়ালো না,কখন তার উপর আবার 'অপারেশন সার্চলাইট' চলে আসে।
-"পালা এসপি পালা, পালালেই বাঁচবি না হলে হরপ্পা মামার হাতে আজকেই তোর ডেথ ডে হয়ে যাবে"
_____________________________
ফোনের ওই পাশ থেকে জ্যাকের বলা কথাগুলো আরজের শ্রবনইন্দ্রিয় হতেই তার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো। আরজে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে ওঠে,
-"জাস্ট কিল দ্যাম ইডিয়েট"
আরজে ফোন কাটার পর কালো লেদার জ্যাকেট পরে, মুখে কালো মাস্ক টেনে, রুম থেকে বেরিয়ে পড়ে। যাওয়ার সময় সানার রুমের দিকে একবার লক্ষ্য করে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিচে পার্কিংলটের কাছে চলে যায়। সেখান থেকে নিজের অতি পছন্দের কলো 'সুজুকি হায়াবুসা' বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
_____________________________
সানার আজ একটু সকালেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। সে হামি তুলে নিচে আসতেই দেখে ঈশানী আসছে। সানা মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি এটে ঠোটে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে এগিয়ে যায় ঈশানীর দিকে। সানা দুদিকে হাত নেড়ে বলে ওঠে,
-"ওয়েলকাম কালনাগিনী, ওয়েলকাম টু জয় বাংলা, আই মিন ব্ল্যাক স্পেস"
ঈশানী মুখ বাকিয়ে বলে ওঠে,
-"ইউ নো হোয়াট, আমি দূর থেকে দেখলাম একটা ডাইনি, আর কাছে এসে দেখি এটা তুই"
পরপর ভেসে আসে সানার কণ্ঠস্বর,
-"আমিও দূরররর... থেকে দেখলাম দরজা ঠেলে একটা কালসাপ আসছে। কাছে এসে দেখি, এ..মা এ তো কোন সাধারণ কালসাপ নয় লা, এতো স্বয়ং কালনাগিনী।"
ঈশানীর মুখে অন্ধকার নেমে এলো। এই মুহূর্তে সানার সাথে ঝগড়া করে নিজের মুড খারাপ করতে চায় না। তাই তার পাশ কাটি আরজের রুমের দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু সিঁড়ির কাছে আসতেই সানা হাত দিয়ে বাঁধ সাধেঁ। ঈশানী কপালে ভাজ পেলে জিজ্ঞেস করে,
-"কি?"
সানার নিরেট কন্ঠস্বর,
-"অ্যাপয়েন্টমেন্ট"
ঈশানি যেন আকাশ থেকে পড়ল,
-"অ্যাপয়েন্টমেন্ট! কিসের?"
-"বারেহ ঘরে সেলিব্রেটি থাকবে আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া আমি যে কাউকে যেতে দেব নাকি?"
-"দেখ এখন আমার মজা করার একদম মোড নাই।"
সানার সহজ সরল স্বীকারোক্তি,
-"আমারও নাই, হাজার দুই ফেল, তারপর জাহান্নামে যাহ আই মিন উপরে যাহ"
ঈশানী এটা নিয়ে পাঁচ মিনিট সানার সাথে তর্ক করে অবশেষে বাধ্য হয়ে দিয়ে দিল। সানা টাকা নিয়ে ছেড়ে দিল তাকে। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে এখনো দুষ্টু হাসি।
ঈশানী আরজের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে গত দশ মিনিট ধরে আরজে কে ডাকছে। কিন্তু আরজে না দরজা খুলছে, না ভেতর থেকে কোন শব্দ আসছে। এবার তার সন্দেহ হলো। সে নিচে তাকিয়ে মালাকে জিজ্ঞেস করে,
-"মালা আরজে কোথায়?"
-"স্যার তো সকাল থেকেই বাসাতে নেই"
-"কিহ"
ঈশানী মুহূর্তে বুঝে ফেলে সানার কারসাজি। এভাবে তাকে গোল খাওয়ালো। সে রাগে গজ্ গজ্ করতে করতে সানার রুমের সামনে যায়। তার দরজাতে কয়েকটা ধাক্কা দিয়ে, জোরে জোরে চিৎকার করে ওঠে,
-"ডাইনি ব্লাডি গার্ল, তোকে আমি ছাড়বো না...."
এভাবে পাঁচ মিনিট রাগ ঝারার পর হঠাৎ সানা পিছন থেকে বলে ওঠে,
-"পারফেক্ট শর্ট"
ঈশানী তড়াক করে পিছনে তাকায়, দেখে সানা মোবাইল হাতে নিয়ে তার দিকেই ধরে আছে,
-"ডিয়ার কালনাগিনী, তুই এতক্ষণ যা যা বলেছিস সব আমি ভিডিও করে ফেলেছি। এখন এটা বল আমি যদি এগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল করি, তাহলে আমি ফেমাস হব কিনা?"
সামনে থাকা ঈশানী এবার একটু ভয় পেয়ে গেল। তার গলা শুকিয়ে আসছে, কেননা এমন ভিডিও ভাইরাল হলে তাকে প্রচুর ট্রলের স্বীকার হতে হবে। সে মুখে মেখি হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
-"তুই এমনটা করতে পারিস না"
-"তুই খুব ভালো করেই জানিস আমি চাইলে তোকে এখান থেকে ধাক্কা মেরে নিচে ফেলে দিতে পারি"
ঈশানীর কন্ঠে ভয় স্পষ্ট,
-"কি চাই সেটা বল"
-"বাহ একদম লাইনে,বেশি কিছু না জাস্ট ওই সময় যা দিয়েছিস তার থেকে পাঁচগুণ বেশি দিবি"
ঈশানীর চোখ বড় বড় হয়ে যায়,
-"অ্যাহ...."
-"আবে অ্যা না হ্যা বল। তুই দিবি কিনা? না হয় আমি এক্ষুনি এটা পোস্ট করে দিচ্ছি"
ঈশানী বাধ্য হয়ে সানাকে আরো দশ হাজার দিয়ে দেয়।
-"দ্যাটস লাইক এ গুড কালনাগিনী আই মিন গার্ল। এভাবেই মাঝে মাঝে সকাল বিকাল আসবি, আর আমার ব্যবসার ঘরে সবুজ বাতি জ্বলবে।"
এই বলে ঈশানীর বাহুতে দুটো চাপড় দিয়ে, সানা ঈশানীকে একটা ঠান্ডা হাসি উপহার দিয়ে নিজের রুমের সামনে গিয়ে আবারো ফিরে তাকায়,
-"বাই দা ওয়ে কালনাগিনী, আমি না ক্যামেরা অন করতেই ভুলে গিয়েছিলাম"
এবার ঈশানী ক্রোধিত হয়ে তার রুমের দিকে যেতেই সানা ঠাস করে ঈশানীর মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেয়। ঈশানী রাগে লাল হওয়া মুখ নিয়ে দরজায় কতক্ষণ আঘাত করে চলে যায়।
এদিকে সানা হাসতে হাসতে নিচে বসে পড়ে। আজ এই কালনাগিনী কে ভালোমতো লুটে নিয়েছে। সে জানত আরজে বাড়িতে নাই।
-"আহ কি মানসিক শান্তি"
সানা একবারে অফিসের জন্য রেডি হয়ে নিচে আসে নাস্তা করতে। সে টেবিলে বসে ভাবছে 'আজকে এই লোকের কি হলো, সকাল থেকেই দেখা যাচ্ছে না। কোথাও আবার রাতারাতি গায়েব হয়ে গেল নাকি।' এমন সময়ে তার নাকে আসে কফি উডের সাথে ভ্যানিলার ঘ্রাণ একদম কাছ থেকে। কেউ তার ঘাড়ের উপর গরম নিঃশ্বাস ফেলে পুরুষালী হাস্কিস্বরে বলে ওঠে,
-"Do you miss me wifey?"
_________________________
গাড়িতে বসে এসপি কতক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছে, সানা আজকে রাস্তায় সবাইকেই শটাকার নোট দান করছে। এসপি কপালে ভাঁজ পেলে তাকে বলে ওঠে,
-"তোর সাথে এত বড় ফকির বসে থাকতে, তুই অন্য কাউকে দান করছিস। আমাকেও কিছু দে"
সানা তার দিকে তাকিয়ে শটাকার একটা নোট এগিয়ে দেয়। এসপি সেটাকে হাতে ধরতেই সানা বলে ওঠে,
-"নে ধর এগুলো কালনাগিনীর টাকা"
-"আরে কি বলছিস কি? বিষে ভরা মানিইইই....!"
-"না... না, নেয় না নে আরো নে"
-"আব্বে হ্যান্ডওয়াশ দেয়য়য়য়...."
-চলবে...
